‘বাপে ক্যাডা জানি না, ভিক্ষা কইরা নিয়া গেলে মা খাইবো’

সন্ধ্যা তখন রাতের শরীরে আছড়ে পড়েছে। সাত মসজিদ রোড খা খা করছে, লোকজন নেই। বিশাল রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে টুং টাং বেল বাজিয়ে দু-একটা সাইকেল রিকশা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। অদূরে মোহাম্মদপুর থানার কাছে কয়েকটা পুলিশ ভ্যান। তার আশপাশে কিছু মানুষজন উঁকি নেওয়া দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে। শঙ্কা আতঙ্ক মেশানো চোখ ঘুরছে কখনো থানা কখনো রাস্তার দিকে।

বাঁ দিকের ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কৈশোরে পৌঁছানোর পূর্ব বয়সের তিন শিশু। ফুটপাতে দাঁরিয়ে নিজেরা আড্ডায় মশগুল। লোকজন নেই রাস্তায়; অনেক সময় পরে কোনো একজন লোকের দেখা মিললে রাস্তায় তিনজনই গিয়ে হাত পাতছে।

লকডাউনের প্রথমদিন শহরজুড়ে থমথমে অবস্থা। অকারণে মানুষজন বের হলেই জেল জরিমানার মুখোমুখি হচ্ছে। ওই যে মোহাম্মদপুর থানার সামনে যারা উঁকিঝুকি মারছে তাদের স্বজনরা আজ অকারণে বেরিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছে নিশ্চই। তাদের ছাড়াতে স্বজনরা এখন থানার সামনে ভিড় করছেন।

বাইকের শব্দ শুনে নিজেদের মধ্যে আড্ডায় বিভোর তিন শিশু আমার দিকে ঘুরে তাকাল। আমি হাসলাম, তারা কাছে এগিয়ে এলো। বললাম তোমাদের ভয় করে না? কিয়ের ভয়? এই যে লকডাউনে বের হইছ, পুলিশ যদি ধরে নিয়ে যায়? আমার কথায় যেন অবাক হলো বেশ। মানে পুলিশ কেন ধরবে, তারা তো অনেক ছোট অকারণে পুলিশ মাঝে মধ্যে ধরে নিয়ে যায় এটা শুনেছে। কিন্তু তাদের ধরবে কেন? তিনজনের মধ্যে একজন একটু এগিয়ে এসেই বলে, ‘পুলিশ ধরলেও আমগো বাইর হইতে হইবো। না বাইর হইলে তো আমরা খাইতে পামু না। আমি ভিক্ষা কইরা নিয়া গেলে আমার মায়ে খাইতে পায়।’

যে ছেলেটা এগিয়ে এলো, তার নাম নয়ন। বয়স, ৮-৯ হতে পারে। থাকে রায়েরবাজার বালুর মাঠ বস্তিতে। বাবা কী করে জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘আমার বাপে ক্যাডা আমি জানি না, আমারে কেউ বাপ সম্পর্কে জানতে চাইলে কেউ কিছু কয় না। আমার এক ভাই আছিল, হেয় লঞ্চে কাম নিছে। এক বোইনের বিয়ে হইয়া গেছে। কিন্তু আমি জন্মের পর বাপরে দেখি নাই। এহন মায়ের লগে আমরা বালুর মাঠের বস্তিতে থাকি। আমি ভিক্ষা কইরা নিয়া যাই হেইডা দিয়া মায়ে চাউল কিনে, বাজার করে, মায়ে খায়, আমি খাই।’

নয়নের সঙ্গে কথা বলার সময় বাকি দুজনও কথা বলে উঠছিল। তবে তাদের কথায় আমার মনোযোগ ছিল না। নয়নের সঙ্গে কথা থামিয়ে এবার বাকি দুজনের সঙ্গে কথা বললাম। একজনের নাম শরীফ। বাবা রশিদ ময়লা ফেলার কাজ করে। মা অন্ধ। তাই সংসারে শরীফের টাকা পয়সা যোগান দিতে হয়। শরীফরা থাকে কালাম মিয়ার বস্তিতে। অপরজনের নাম ইয়াসিন। বাবা সুমন রিকশা চালায়, মা রেখা কিছুই করেন না।

শরীফ, নয়ন ও ইয়াসিন- প্রতিদিন তিনজন মিলে রায়েরবাজার ইউসুফ স্কুলের সামনে আসে। এরপর তারা ধানমন্ডিতে ঢুকে সাত মসজিদ রোড চষে ভিক্ষা করে। প্রতিদিন ৬০-৭০ টাকা আয় হয়। নয়ন বলে, ‘আমরা এক লগে আহি, ভিক্ষা কইরা আমরা রাইতে চইলা যাই, ৬০-৭০ টেকা হয়, আবার কুনসুম ১০০ টেকার উপরেও পাই। তহন আমগো খুব ভাল্লাগে।।’ বললাম এই যে লকডাউন চালু হইছে তোমরা বাইর হইছ ক্যান, পুলিশ তো বলছে বাইর হইলে ধরব… ‘আমরা তো দূর থিকা পুলিশ দেখলেই লুকাই যাই। ভিক্ষা না করলে যে খাইতে পামু না, খিদা লাগলে কষ্ট লাগে।’

বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। তাদের বললাম তোমাদের ছবি তুলব। তারা ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। জিজ্ঞেসও করল না, ছবি কেন; কোথায় ব্যবহৃত হবে! নাকি তারা জেনে গেছে। পথের শিশু তারা স্কুল যায় না, কিন্তু এখনই জীবনের কঠিন বাঁকগুলো চিনে নিয়েছে। তাদের বেঁচে থাকার পদ্ধতিতে বাঁধা হতে পারে না প্রকৃতিক কোনো বাধা কিংবা সামাজিক কোনো নিয়ম।

যে ছেলেটা এগিয়ে এল, তার নাম নয়ন। বয়স, ৮-৯ হতে পারে। থাকে রায়ের বাজার বালুর মাঠ বস্তিতে। বাবা কী করে জিজ্ঞেস করতেই বললো, ‘আমার বাপে ক্যাডা আমি জানি না, আমারে কেউ বাপ সম্পর্কে জানতে চাইলে কেউ কিছু কয় না। আমার এক ভাই আছিল, হেয় লঞ্চে কাম নিছে