ঈদের সময় গণপরিবহন বন্ধ রাখার চিন্তা করছে সরকার!

মহামারি করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সারা দেশে চলমান লকডাউন পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় ঈদুল ফিতরের সময় আন্তজে’লা গণপরিবহন বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এই সময়ে এক জে’লা থেকে আরেক জে’লায় বাস চলাচল করবে না। শ্রমিকদের যাতে ঈদের সময় ছুটি না দেওয়া হয়, সে প্রস্তাব পাঠানো হবে পোশাক কারখানার মালিকদের কাছে।

অন্যদিকে বিপণিবিতানগু'লোতে যদি স্বাস্থ্যবিধি মানা না হয়, তবে দু-এক দিন দেখে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার জরিমানাসহ কঠোর পদ'ক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। খবর- প্রথম আলোর

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকানোর জন্য সরকার ‘চলমান লকডাউন পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও ভবি'ষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ’ বি'ষয়ে রোববার (০২ এপ্রিল) এক ভার্চ্যুয়াল সভায় উপস্থিত মেয়র, সচিব, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের কাছ থেকে এমন প্রস্তাব উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সরকার ঘোষিত চলমান লকডাউনের মেয়াদ ৫ মে শেষ হবে। পরবর্তী করণীয় ঠিক করতেই গতকাল এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ বলেছেন, পরিবহন বন্ধ করতে হলে সব বন্ধ রাখতে হবে। আর নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে ঈদের পরে নেওয়ার মতামত দেন তিনি। আইজিপি বলেন, এখন ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের সময়। সরকার এখন বেশি শক্ত হবে কি না, তা বিবেচনার বি'ষয়। তিনি ঈদের পরের তিন স'প্ত াহ কড়াকড়ি করার কথা বলেন।

সংশ্লি'ষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, আন্তজে’লা বাসগু'লো ঢাকার ভেতরে না ঢুকে যেন ঢাকার বাইরে টার্মিনালে থাকে। তিনি আন্তজে’লা লঞ্চ ও রেলওয়ে বন্ধ থাকার ওপরও জোর দেন। তিনি বলেন, সদরঘাট, কম'লাপুর, সায়েদাবাদ—তিনটি জায়গা জনসমাগমের উৎস। এই তিন স্থান বিবেচনায় রেখে যেন লকডাউনের রূপরেখা তৈরি করা হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, তাঁর এলাকার মধ্যে বিমানবন্দর স্টেশন, মহাখালী ও গাবতলী বাসস্ট্যান্ড, এই তিন স্থানে জনসমাগম হয়। এ ছাড়া তিনি বিপণিবিতানগু'লোর ভ'য়াবহ অবস্থার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গু'লশানের যতগু'লো মার্কেট আছে, সব কটিতেই ভ'য়াবহ অবস্থা। স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। তিনি তাঁর এলাকার ৭২ জন কাউন্সিলর ও পুলিশের সমন্বয় করে এ অবস্থা মোকাবিলা করতে পারবেন বলে উল্লেখ করেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গাজীপুর সিটিতে ২২ থেকে ২৪ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ঈদের দু-তিন আগে থেকে ২৪ ঘণ্টা বাস, ট্রাক দিয়ে তাঁরা যাওয়া-আসা করেন। এর ফলে করোনা পরিস্থিতি ভ'য়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ঈদের ছুটিতে যেন তাঁরা আসা-যাওয়া না করেন, এমন ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন বি'ষয়টি গু'রুত্বের সঙ্গে দেখে।

বৈঠকের বি'ষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘আমি বলেছি নারায়ণগঞ্জের চিত্র দেখে ভয় লাগছে। নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রচুর মানুষ বসবাস করে। কঠিনভাবে নির্দেশনা না দিলে সাম'লানো মুশকিল হবে।’ তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে যেন এই শহরের সব মানুষই রাস্তায় ও বিপণিবিতানে।’

বৈঠকে উপস্থিত চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহের মেয়র বলেন, বিপণিবিতান, কাঁচাবাজারে কোথাও গেলে মনে হয় না লকডাউন আছে। বিপণিবিতানের এ অবস্থা থাকলে ভারতের মতো অবস্থা হবে। ঈদ উপলক্ষে যদি ঢাকা থেকে লোক না আসে, তবে নিয়ন্ত্রণ করা যাব'ে বলে তাঁরা মতপ্রকাশ করেন। ঈদের পর বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্লাব বা সংগঠনের উদ্বোধন, জন্ম'দিন, ধর্মীয় সভা-সমাবেশ না করার বি'ষয়ে তাঁরা মত দিয়েছেন বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহম'দ কায়কাউস বলেন, ঈদের সময় চলাচল বন্ধ করতে হলে মালিকদের পদ'ক্ষেপ নিতে হবে। তাঁদের বলতে হবে কেউ ছুটি পাবে না। না হলে আগের ১৮ দফা মেনেই আমর'া সামনে এগোতে পারি।

সার্'বিক বি'ষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমা'দের সংক্রমণের বড় জায়গা বিপণিবিতান। যদি দোকানপাটে কেউ মাস্ক না পরে তাহলে বন্ধ করে দেওয়াই ভালো। এ ছাড়া আন্তজে’লা চলাচল, আন্তশহর চলাচল কোনোভাবেই করা যাব'ে না। গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে পরিবহন খাতকে ক্ষ'তিপূরণ দিতে হবে। সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে। এবারের ঈদে আমর'া যে যেখানে আছি, সেখানেই থাকতে হবে।’

জানতে চাইলে যোগাযোগসচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদের সময় আন্তজে’লা গণপরিবহন বন্ধ রাখার প্রস্তাব এসেছে। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবহনশ্রমিকদের প্রণোদনার প্রস্তাব করেছি আমি। কারণ, তাঁরা তো ঈদের সময় গাড়ি চালিয়ে আয় করতেন।’

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ৫ এপ্রিল থেকে সাত দিনের লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। তখন ক্ষো'ভে ফেটে পড়ে দোকান মালিক সমিতি ও কর্মচারীরা। দোকানপাট খুলে দেয়ার দাবিতে রাস্তায় নামে তারা।

৭ এপ্রিল থেকে অফিসমুখী মানুষের ক'ষ্ট লাঘবে খুলে দেয়া হয় গণপরিবহন। লকডাউনের তৃতীয় দিন সিটি করপোরেশন এলাকায় গণপরিবহন চলা শুরু হয়। আর তাতে স্বাভা'বিক রূপে ফিরে আসে রাজধানী ঢাকা। তাতে আরও ক্ষু'ব্ধ হন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবির মুখে ৯ এপ্রিল থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে দোকানপাট ও শপিং মল খুলে দেয় সরকার।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ৮ এপ্রিল দেয়া এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ৯ থেকে ১৩ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে 'বিকেল ৫টা পর্যন্ত কঠোর স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন সা'পেক্ষে দোকানপাটও শপিং মল খোলা রাখা যাব'ে।

স্বাস্থ্যবিধি মানা না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানানো হয় প্রজ্ঞাপনে। তবে ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ‘সর্বাত্মক’ লকডাউনে আবারও কঠোর হয় সরকার। ঘোষণা আসে, বন্ধ রাখতে হবে সব শপিং মল, দোকানপাট। দ্বিতীয় দফায় ‘সর্বাত্মক’ লকডাউন আরও এক স'প্ত াহ বাড়ানো হয় আগের শর্ত মেনে।

এমন অবস্থার মধ্যে জীবন-জী'বিকার বি'ষয় বিবেচনায় নিয়ে আবারও নমনীয় হয় সরকার। শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে ২৫ এপ্রিল থেকে খুলবে দোকানপাট ও শপিংমল। তবে 'বিকিকিনির সময় সকাল ১০টা থেকে 'বিকাল ৫টা পর্যন্ত।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও জী'বিকার বি'ষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বি'ষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লি'ষ্ট বাজার বা সংস্থার ব্যবস্থাপনা কমিটিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।