ঈদের আগেই বড় বোনের সঙ্গে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তুলির

দরিদ্র পরিবারের ফুটফুটে কিশোরী তুলি। বাবা আব্দুল মান্নান পেশায় একজন কৃষক। তারপরেও ৮ ছেলেমেয়েকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন লেখাপড়া করাতে। তুলি স্থানীয় কালাউক উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়তো।

লকডাউনে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তুলি ও তার কলেজ পড়ুয়া বড় বোন লিমা সিদ্ধান্ত নেয় অবসর সময়ে ঢাকায় কাজ করে বাবাকে সহযোগিতা করার। গ্রাামের আরও কয়েকজনের পরামর্শে তারা কাজ নেয় নারায়ণগঞ্জের সেজান জুস কারখানায়। ঈদের আগেই দু’জনের বাড়ি ফেরার কথা। কিন্তু আর বাড়ি ফেরা হলো না তুলির।

সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড শুরু হলে লিমা নিচতলায় থাকায় বেরিয়ে আসতে পেরেছে। কিন্তু তুলি ছিল চতুর্থ তলায়। কারাখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে বড় বোন রক্ষা পেলেও এখনো নিখোঁজ ছোট বোন তুলি। ধারণা করা হচ্ছে ৫২ জনের মধ্যে তুলির ভাগ্যেও জুটেছে নির্মম কিছু।

তুলি ও লিমা হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রামের আব্দুল মান্নানের মেয়ে। তাদের বড় বোন হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজে অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জুহি আক্তার জানান, সংসারে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা তাই লকডাউনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সুযোগে দুই বোন মিলে অর্থ উপার্জনের জন্য কাজে গিয়েছিল। তুলি গত ৩০শে জুন স্কুলে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়ে ওইদিনই কর্মস্থলে যায়। কোরবানি ঈদের আগেই তাদের বাড়ি ফেরার কথা ছিল।

সরজমিন ভাদিকারা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তাদের খবর শোনার পর থেকে কান্নায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তুলির মা। পুরো পরিবারে শোকের মাতম। তুলির বাবা আব্দুল মান্নান বলেন, আমার ৬ মেয়ে ও ২ ছেলে। এদের মধ্যে তুলি ছিল ৫ নম্বর। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে গিয়ে আমার মেয়ের উচ্চ শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন পুড়ে গেছে আগুনে। তিনি সরকারি সহযোগিতাও কামনা করেছেন।

অগ্নিকাণ্ডের বিভীষিকাময় অবস্থা থেকে ফিরে আসা লিমা ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একসঙ্গে কাজ করতে গিয়েছিলাম। আমার বোন ৪ তলায় আর আমি নিচতলায় কাজ করতাম। আমরা অনেক কষ্টে বের হয়ে দেখেছি ৪ তলায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। শুধু প্রাণ বাঁচানোর চিৎকার আর আর্তনাদ শুনেছি।

এ সময় আমাদের কিছুই করার ছিলনা। হয়তো সবার সঙ্গে আমার আদরের ছোট বোনটিও ছাই হয়ে গেছে। সেজান জুস ৭ তলা কারখানাটির নিচতলার একটি ফ্লোরের কার্টন থেকে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। একপর্যায়ে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে।

এ সময় কালো ধোঁয়ায় কারখানাটি অন্ধকার হয়ে যায়। একপর্যায়ে শ্রমিকরা ছোটাছুটি করতে শুরু করে। কেউ কেউ ভবনের ছাদে অবস্থান নেয়। আবার কেউ কেউ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হয়। এ কারখানায় প্রায় ৭ হাজার শ্রমিক কাজ করে। এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ৫২টি মরদেহ।