স্বপ্ন ছিল বাড়ি এসে বানাবেন ঘর, লাশ হয়ে ফিরলেন মিনা

ঝড়ে একবার ছাপড়া ঘরটি লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। সেটি আর দাঁড় করানো যায়নি। সেই থেকে বাস্তুভিটা বলতে কিছুই ছিল না মিনা আক্তারের (৩০)। দিনমজুর স্বামী হারুণ অর রশিদের আয়-দায়ও নগন্য।

তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোথায় থাকবেন, কী খাবেন? এ অনিশ্চয়তার মুখে সপরিবারে পাড়ি দেন রাজধানী ঢাকায়। স্বপ্ন ছিল মাথা গোঁজার ঠাই-একটি ঘর। আর জীবন-জীবিকার অন্বেষণ।

মেয়ে সোমা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তাকে নিয়ে রূপগঞ্জের সেজান জুস কারাখানায় চাকরি নেন মিনা। ছেলে আহাদও সামান্য বেতনে একই সঙ্গে যোগ দেয় সেখানে।

কারখানায় যেদিন আগুন লাগে চার তলায় কাজ করছিলেন মিনা। আহাদের ছুটি হয়ে যাওয়ায় সে আগে বের হয়ে গিয়েছিল। আর সোমা ছুটি নিয়ে বাড়িতে গিয়েছিল।

কারখানার আগুন যখন ভয়াবহ আকার নেয়। তখন জীবন বাঁচাতে মিনা চারতলার জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে মারা যান। খবর পেয়ে মিনার স্বামী ও ছেলে হাসপতালে লাশ শনাক্ত করেন। শুক্রবার কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কুকিমাদল গ্রামে নিজ বাড়িতে তার লাশ দাফন করা হয়।

আজ সোমবার তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় পতিত ভিটার পাশেই মিনা কবর দিয়েছেন স্বজনরা। কবরের পাশে বসে কাঁদছিল সোমা। সোমা জানায়, তার ইচ্ছে ছিল, কারখানায় কাজ করে পড়শোনাটা চালিয়ে যাবে।

সে জানায়, রাজধানীর গাউছিয়া এলাকার গামের্ন্টস রোডে একটি ভাড়া বাসায় থাকত তারা। নয় বছর বয়সী ছোটভাই রবিনকে ঘরে একা রেখে তারা সবাই কাজে যেত। বাবা শহরে দিনমজুরি করতেন। মায়ের এমন মৃত্যু তাদের সব স্বপ্ন সাধ এলোমেলো করে দিয়েছে।

আহাদ জানায়, এখন পর্যন্ত কারখানার লোকজন তাদের কোনো খোঁজ নেয়নি। কোনো সহযোগিতা দেয়নি। এ অবস্থায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা পরিবারটিকে দু’লাখ টাকা দিয়েছে।

রবিবার সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম নিজে নিহত মিনার বাড়িতে গিয়ে দুলাখ টাকার চেক পরিবারটির হাতে তুলে দিয়েছেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন, করিমগঞ্জের ইউএনও মোহাম্মদ আবু রিয়াদ ও কিশোরগঞ্জ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক শাহ মোফাখখারুল ইসলাম।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন, ওই কারখানায় কর্মরত কিশোরগঞ্জের মোট ২১ জন নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যে করিমগঞ্জের ১০ জন। তাদের মধ্যে কেবল মিনার লাশ পাওয়া গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে শনাক্ত সাপেক্ষে সবাইকে পুনর্বাসন ও সহায়তা দেওয়া হবে। আর মিনার পরিবারের জন্য একটি ঘর করে দেওয়ার বিষয়টিও আন্তরিক বিবেচনায় রয়েছে।