ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে পান পাতার ব্যবহার

ভারতবর্ষের প্রাচীন ভেষজ গ্রন্থ আয়ুর্বেদে নিঃশ্বাস দুর্গন্ধমুক্ত রাখার জন্য পান সেবনের উল্লেখ আছে। নিয়মিত পান সুপারি খেলে নিঃশ্বাসে কোনো দুর্গন্ধ থাকে না, হজমও ভালো হয়। এটি এ উপমহাদেশের এক প্রাচীন ধারণা ও লোক অভ্যাস।

ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী নিচে পান খাওয়ার উল্লেখযোগ্য কিছু উপকারিতার কথা বর্ণনা করা হলো।

হজমে সাহায্য করে-পান খেলে লালাগ্রন্থির নিঃসরণ বেড়ে যায়। এ লালার কারণেই হজমের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হয়। লালার মধ্যে থাকা বিভিন্ন এনজাইম বা উৎসেচক খাদ্যকে কণায় ভাঙতে সাহায্য করে যার ফলে হজম ভালো হয়।

শুধু পান পাতা চিবিয়ে খেলেও এ উপকার পাওয়া যায়। কোমল পানীয় খাওয়ার চেয়ে এটা নিশ্চয়ই ভালো। বদহজম হলে পানিতে পান পাতা টুকরো করে কেটে কিছুক্ষণ সিদ্ধ করতে হবে। সিদ্ধ করা বা জ্বাল দেয়ার সময় তাতে কয়েকটা গোলমরিচ দিতে হবে। তারপর তা নামিয়ে ছাঁকতে হবে। তারপর ঠাণ্ডা করে তা খেতে হবে। এতে হজম ভালো হবে, বদহজম বা অজীর্ণ হলে সেটাও চলে যাবে।

মুখের দুর্গন্ধ দূর করে-খাবার গ্রহণের পর তার কণা মুখের ভেতরে, দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকে। এগুলো ব্যাকটেরিয়া পচিয়ে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। পান খেলে তার রস জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে এসব ব্যাকটেরিয়াকে জন্মাতে দেয় না। ফলে মুখের স্বাস্থ্য ভালো থাকে ও মুখে দুর্গন্ধ হয় না।

গ্যাস্ট্রিক আলসার নিরাময় করে-পান খেলে পেটে বায়ু কম হয় ও গ্যাস হয় না। এর ফলে গ্যাস্ট্রিক ও তা থেকে আলসার সৃষ্টির সুযোগ কমে যায়। পানের রস হজমে সাহায্য করায় তা পেটে বদ গ্যাস তৈরি রোধ করে। ফলে পেট ফাঁপে না ও গ্যাস্ট্রিক হয় না।

উঁকুন মরে-মাথায় উঁকুন হলে গোসলের কিছুক্ষণ আগে পান পাতার রস মাথায় লাগিয়ে বসে থাকলে উঁকুন মরে যায়। এ কাজে ঝাল পান হলে ভালো হয়।

চর্মরোগ সারায়-দেহের কোথাও দাদ বা চুলকানি পাঁচড়া হলে সেখানে ঘষে পান পাতার রস লাগিয়ে দিলে কয়েক দিনের মধ্যে তা সেরে যায়।

পাইওরিয়া ভালো করে-দাঁতের মাঢ়ি দূষিত হলে সেখানে ফুলে যায় ও পুঁজ হয়, ক্ষত হয়। এক্ষেত্রে পানের রসের সাথে অল্প পানি মিশিয়ে কুলকুলি করলে সেখান থেকে আর পুঁজ পড়ে না, ধীরে ধীরে ক্ষতও শুকিয়ে যায়। মুখগহ্বরে কোনো ক্ষত হলে পানের রসে তার উপশম হয়। পানের রসে এসকরবিক এসিড আছে যা একটি চমৎকার এন্টিঅক্সিডেন্ট। এটা মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে-পান রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে গবেষণায় জানা গেছে। পানে ডায়াবেটিস প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য আছে।

সর্দি বের করে-বুকের ভেতর কফ/সর্দি বা শ্লেষ্মা জমা হলে তা বের করতে পানের রস কার্যকর। এক্ষেত্রে পানের রসের সাথে মধু মিশিয়ে কয়েক দিন খেতে হবে। এতে বুকে জমা কফ বেরিয়ে যাবে।

মাথা ব্যথা দূর করে-মাথা ব্যথা হলে কপালে পানের রস লেপে দিলে দ্রুত মাথাব্যথা কমে যায়।

ক্ষত ও ব্যথা সারায়-পানের বেদনানাশক ও ক্ষত সারানোর ক্ষমতা আছে। ক্ষতস্থানে পানের রস লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে রাখলে দুই-চার দিনের মধ্যেই ক্ষতস্থান শুকিয়ে যায়। কোথাও ব্যথা হলে পান পাতা বেটে মলমের মতো সেখানে লেপে দিলে দ্রুত ব্যথা কমে। দেহের ভেতরে কোথাও ব্যথা হলে পানের রস করে পানিতে মিশিয়ে তা শরবতের মতো খেতে হবে। শুধু পান পাতা চিবিয়ে রস খাওয়ার পার পানি খেলেও এ উপকার পাওয়া যায়।

ক্ষুধা বৃদ্ধি করে-পাকস্থলী গড়বড় হলে সবই উল্টে যায়। খিদেও লাগে না। পাকস্থলীতে অম্লমান বা পিএইচের মাত্রা স্বাভাবিক না থাকলেই এরূপ হয়। পান তা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। ফলে শুধু পান পাতা চিবিয়ে খেলেও ক্ষুধা বাড়ে।

এন্টিসেপটিকের কাজ করে
কোথাও কেটে গেলে দ্রুত সেখানে পানের রস লাগিয়ে দিলে জীবাণু সংক্রমণের ভয় থাকে না। পান পাতা পলিফেনল বিশেষত চাভিকল নামক রাসায়নিক উপাদানে পূর্ণ। এটা জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে। এ ছাড়া সেখানে ফোলাও বন্ধ করে, ব্যথার উপশম করে। শরীরের যেসব অংশ প্রায় সময়ই ঘামে ভেজা থাকে সেখানে নানা রকম ছত্রাক জন্ম নেয় ও দাদের মতো চর্ম রোগের জন্ম দেয়। পানের রস সেখানে লাগালে তা এন্টিসেপটিকের কাজ করে ও ছত্রাক জীবাণু ধ্বংস করে।

মূত্র স্বল্পতা ও মূত্রকৃচ্ছতার উপশম করে
যাদের কম প্রস্রাব হয় বা প্রস্রাব করতে গেলে কষ্ট হয় তারা পান পাতার রস সেবন করে উপকার পেতে পারেন। এক্ষেত্রে ১টি পান পাতা ছেঁচে রস করতে হবে। সেই রস একটু দুধের সাথে মিশিয়ে পান করলে উপকার হবে। এতে দেহে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়বে ও মূত্রকৃচ্ছতা চলে যাবে।

শিশুদের পেট ব্যথা কমায়
পেটে ব্যথা হলে ছোট্ট শিশুরা কাঁদতে থাকে। বড় শিশুরা হয়তো বলতে থােক, পেট চেপে ধরে কাতরাতে থাকে। এ অবস্থায় পান পাতার চকচকে পিঠে নারিকেল তেল মাখিয়ে তা গরম করে সেই পাতা পেটের ওপর চেপে ধরে সেঁক দিতে হবে। ৩-৪ মিনিট পর পর এভাবে কয়েকবার সেঁক দিলে পেটে ব্যথা কমে যাবে। খেয়াল রাখতে হবে সেঁকের সময় তাপটা যেন বেশি না হয়।

গলাব্যথা দূর করে
গলাব্যথা হলে খুব সহজেই তা পান পাতা ব্যবহার করে দূর করা যায়। এক্ষেত্রে ১ চা চামচ পান পাতার রস এ গ্লাস গরম পানিতে মিশিয়ে গড়গড়া বা গার্গেল করতে হবে।

দাঁতে ব্যথা কমায়
দাঁতে ব্যথা হলে ২ কাপ পানিতে ২-৩টি পান পাতা সিদ্ধ করতে হবে। জ্বাল দিতে দিতে ১ কাপ থাকতে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে তা দিয়ে কুলকুলি করতে হবে। এতে দাঁতে ব্যথা কমে যাবে।