পদ্মা সেতু: নির্মাণে ব্যয় ২,৭৬৮ দিন, ২০ দেশের মেধা

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু। দৈর্ঘ্যে যেমন বড়, তেমনি এর নির্মাণযজ্ঞের প্রতিটি পর্বেই বিশালত্বের ছাপ দেখা গেছে। পাইলিং থেকে শুরু করে স্প্যান বসানো—নানা পর্বে সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ব রেকর্ড।

অনেক প্রযুক্তি এবং যন্ত্রের ব্যবহার হয়েছে, যা দেশে আগে কখনো হয়নি। বালু, রড, সিমেন্ট, ইস্পাত, ইট, পাথর—উপকরণের ব্যবহার হয়েছে বিপুল পরিমাণে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে সেসব পরিসংখ্যান পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। সেতু-সম্পর্কিত তথ্যের সূত্র সেতু বিভাগ।

দেশের মানুষ পদ্মা সেতুর চালুর ক্ষণগণনা করছে। ২৫ জুন থেকে চলবে যানবাহন। তখন চাইলে যানবাহনে পদ্মা নদী পাড়ি দেওয়া যাবে ছয় কিংবা সাত মিনিটে। এই সেতু নির্মাণে বহু মেধা ও মানুষের শ্রম যুক্ত রয়েছে। প্রতিটি সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা ধরে চলেছে কাজ।

মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর। উদ্বোধন হবে ২০২২ সালের ২৫ জুন। সে হিসাবে, পুরো সেতু নির্মাণে সময় লেগেছে মোট ২ হাজার ৭৬৮ দিন। এই সময়ে করোনা মহামারি, বন্যার ভাঙন, নদীর স্রোত কিংবা পাইলিংয়ে জটিলতা কখনো কখনো কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘ এই যাত্রায় একদিনের জন্যও কাজ থেমে থাকেনি।

এই লম্বা সময়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজে জড়িয়ে আছে ২০টি দেশের মানুষের মেধা। দেশগুলো হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন, সিঙ্গাপুর, জাপান, ডেনমার্ক, ইতালি, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, ফিলিপাইন, ভারত, তাইওয়ান, নেপাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশ।

পদ্মা সেতুর বিশদ নকশা করা হয় হংকংয়ে। এতে নেতৃত্ব দেন ব্রিটিশ নাগরিক রবিন শ্যাম। তিনি লম্বা স্প্যানের সেতুর নকশা প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ। ২০১৮ সালে ব্রিটেনের রানি তাঁকে কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ আম্পায়ার পুরস্কারে ভূষিত করেন। নকশা প্রণয়নে ব্যবস্থাপক ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কেন হুইটলার।

সেতুর নির্মাণকাজের তদারকির নেতৃত্ব দেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক রবার্ট জন এভস। আর নদীশাসনের নকশা প্রণয়নে ছিলেন কানাডার ব্রুস ওয়ালেস। এ কাজে আরও ছিলেন জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৌশলীরাও। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ১৩৮ ব্যক্তি। এর মধ্যে প্রকল্প পরিচালকসহ বড় পদে আছেন ৩২ জন। তাঁদের মধ্যে মো. শফিকুল ইসলাম সড়ক ও জনপদের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে থাকাকালে ২০১১ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক হন। তাঁর অধীনে ঠিকাদার নিয়োগ ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে। আগামী বছর জুন পর্যন্ত তিনি পরিচালক হিসেবে থাকছেন। ২০১৩ সালে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পরও সরকার তাঁকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে রেখে দেয়।

প্রকল্পের উপপরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্বে রয়েছেন সওজের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান। তিনি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম লালন শাহ সেতুর নির্মাণে যুক্ত ছিলেন।

পদ্মা সেতুতে ১০টি দেশের বিপুল উপকরণ ব্যবহার করা হয়। আরও প্রায় ৫০টি দেশের কিছু না কিছু উপকরণ এতে ব্যবহার হয়েছে। বাংলাদেশের বাইরে পদ্মা সেতু প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি উপকরণ কেনা হয়েছে চীন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, লুক্সেমবার্গ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মূল সেতুতে প্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার টন স্টিলের প্লেট লেগেছে, যার সবই এসেছে চীন থেকে।

সূত্র: প্রথম আলো