বাবা মারা যাওয়ার ১ মিনিট পর

ল’জ্জার মাথা খেয়ে যখন ছা’ত্রীর মায়ের কাছ থেকে মাসের অ’গ্রিম বেতনের টাকা'টা চাইলাম। ছা’ত্রীর মা আমার দিকে কিছুসময় তাকিয়ে কি যেন ভা’বলেন। তারপর রুমের ভেতরে গিয়ে কিছুসময় পরে চক’চকা ১৫০০ টাকা নিয়ে এসে আমার হাতে ধ’রিয়ে দিয়ে বললেন,
—-এতে কি হবে??

বেতন ২০০০ টাকা। তার মধ্যে ৫০০ টাকা কম দিয়ে এই কথা বলা মানে, পা’নির মধ্যে অর্ধেক খানি চু’বিয়ে রেখে শা'স্তি দেওয়া একি কথা। কিন্তু তবুও আ’ন্টির সামনে হাসি মুখ করে বললাম,

—জি আন্টি চলে যাব'ে।
আন্টি কিছু না বলে কি’চেনের দিকে চলে গেলেন।

আমি ত’ন্নীকে পড়ানো শুরু করলাম।
আমি আনিকা। এবার বিবিএ ২য় বর্ষতে এ’কাউন্টিং নিয়ে পড়ছি। ছোট থেকে স্যার স’কল বলতো তোমার মাথা অনেক ভালো মা, তুমি চে'ষ্টা করো, ভ’বি'ষ্যতে কোন ভালো জা’য়গায় চান্স পেতে পা’রবা।

আমি তখন স্যা’রদের কথাতে হাসিমাখা মুখ নিয়ে বাড়িতে ফিরে আম্মুকে স্যা’রদের করা প্রশংসামুলক কথাগু'লো শো’নাতাম। আম্মা আমায় অনেক আশা দিলেও বাবা ব’লতো,

—মাইয়া মানুষ। ওতো পড়োন লেহোনের দরকার নাই।আ’মি তখন মন খারাপ করে ঘর থেকে বের হয়ে আ’সতাম। পুকুর তলায় বসে বসে কিছু সময় কান্না ক’রতাম। তারপর স্যা’রদের কথা মনে করে মনে জোর পে’তাম। তখন ভাবতাম বাবা যা বলার ব’লুক। আমি পড়বোই আর যেভাবেই হোক ভালো জা’য়গাতেই প’ড়বো।

ছোট থেকেই জেদে ট’ইটুম্বুর হয়ে জন্ম নি’য়েছিলাম। আম্মু মা’ঝে মাঝে বলতো,–মা, মাইয়া মা’ইনষের অতো রাগ, মে’জাজ, জেদ ভালো না। তা’রপর আ’মর'া গরিব মা’নুষ।আমি তখন আ’ম্মুর দিকে চেয়ে বলতাম, বই এর কোন জা’য়গায় লেহা আছে, রাগ, জেদ, মে’জাজ খালি বড় লো’কদের থাকন লা’গবো??

আ’মার প্রশ্ন শুনে আম্মা চুপ করে থাকতো।এক এক করে সবগু'লো লে’ভেল ভালো ভাবেই পাড় ক’রলাম। এসএসসিতে A+ আসলেও ইন্টারে গিয়ে মাত্র ৫ প’য়েন্টের জন্য A+ আসলো না। মনটা খা’রাপ ছিল কিন্তু তা’রপরও আলহাম'দুলিল্লাহ ব’লেছিলাম।

এরপর নাম'লাম আসল যুদ্ধে, মানে ভর্তিযুদ্ধ।আমার ফ্রে’ন্ডস সকলে ভালো জায়গায় কোচিং শুরু করলেও আমি করতে পা’রলাম না টা’কার অভাবে। রাত্রে ঘু'ম আসতো না আমার। নিঃশব্দে কান্না ক’রতাম। এত অ’ভাবের মধ্যে কেনো পা’ঠাইলা আল্লাহ।শুধু ভা’গ্যকে দোষ দি’তাম।

পুরাতন লা’ইব্রেরি থেকে একটা পুরাতন বই কিনে পড়তে শুরু ক’রলাম। কিন্তু পড়েও কোন লাভ হলো না। ঢাকা ই’উনিভার্সিটির ফরম উ’ঠানোর লা'ষ্ট ডে’টটা শেষ হয়ে গেলেও আমি টাকা জো’গার করতে পারিনি। জ’হাঙ্গিরনগরে’রটা তুলতে পারলেও গা’ড়িভাড়া না থাকায় এক্সাম দিতে যেতে পা’রলাম না। ঐদিনে এতটা রাগ হয়েছিল যে বা’বাকে সরাসরি বলেছিলাম,

–এক মাইয়ার জন্য কয়টা টাকা যো’গাতে পারো না তে জ’ন্মায়ছিলা ক্যা??বাবা আমার দিকে অ’সহায় দৃ'ষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, কিছু বলতে পা’রেনি। আম্মা আমায় টেনে বা’হিরে নিয়ে এসেছিল।রাত্রে বাবার কাছে গিয়ে ব’লেছিলাম,

–বাবা, আমায় ক্ষ’মা করো। আমার ভুল হয়ে গি’য়েছে। আরো কিছু বলার আ’গেই,
বাবা আমাকে লুঙ্গির গিট থেকে ১০ টাকা ৫ টাকার অ’নেকগু'লো নোট বের করে গু'নতে ব’লল। আমি গু'নে দেখি ৩৪০ টাকা আছে সেখানে।

বা’বাকে বললাম, বাবা ৩৪০ টাকা আছে।
বাবা আমার দিকে অ'সহায় ভাবে তাকিয়ে বলল, আ’মার কাছে এর চাইতে আর বেশি নাই রে মা।

আমি তখন অবাক হয়ে বা’বার দিকে তাকিয়ে দেখি বাবার চোখে পানি। হাতের মধ্যে টা’কাগু'লো ফেরত দেওয়ার সময় বাবার হা’তটা কেঁপে উঠল।
আমি বাবার হাতটা উ’ল্টায়ে দেখি হাতে কড়া পড়ে গিয়েছে। অ’জান্তেই চোখে পানি চলে এল।

আমার বাবা একজন দি’নমজুর। আর মা বাসাতেই চট বুনে সংসারের জন্য অ’তিরিক্ত আয় করার চে'ষ্টা ক’রেন।
ঐ রা’তটা ছিল আমার স্বপ্ন গু'লোকে জী’বন্ত কবর দেওয়ার রাত।

বাহিরে অ’মাবস্যার কালো অ’ন্ধকারে নিজের চোখের জল দেখার মতো কেউ ছিল না। এত ব’ছরের আশাকে ভেতরে মে”রে ফেলা যে কতটা ক’'ষ্টের সেটা শুধু সেই মানুষটাই বুঝতে পারে যেই মানুষটা এই অ’বস্থার স’ম্মুখীন হয়েছে।

এরপরে, প’য়েন্টের মাধ্যমে জাতীয় ই’উনিভার্সিটি তে ভর্তি হই। বাবা জোর করে ভর্তি করায়ে দেয়। আমার তো প’ড়াশোনার ইচ্ছা /শখ সব শেষ হয়ে গি’য়েছিল। কিন্তু বাবাই আমাকে গ্রাম থেকে শহরে নিয়ে এসে ভ’র্তি করায়ে দেয়। বাসা থেকে প্রায় ৪৫ কি.মি. দূরে কলেজ জন্য ই’উনিভার্সিটির পাশেই একটা মেসে এসে উ’ঠলাম। মাসে বাবা টে’নেটুনে ১০০০ টাকা দিতে পারতো। আমি অনেক ক'ষ্টে প্রা’ইভেট, টি’উশনি যোগার করে পড়ানোর চে'ষ্টা করলেও, টিকে থাকতে পা’রতাম না। কারন বা’চ্চাদের মা গু'লো সবসময় বি’র’ক্ত করতো। মনে 'হতো সে আ’মার টিচার। আমাকে বলে দিতো,এই টা পড়াও ওইটা পড়াও। এইটা প’ড়াবা না। ওইটা পড়াবা না। একদিন বি’র’ক্ত আর রাগে ছাত্রের মাকে বললাম,

–আন্টি, আপনি এত জানেন এত পারেন তো আ’মাকে রা’খছেন কেন??
তারপর আর ও বাড়িতে যায়নি।

বর্তমানে যেই বাসায় টি’উশনি করায় এখানে সব ফ্যা'’সিলিটি পেলেও মাস শেষে বেতন দিতে তা’লবাহানা করে। আর ২০০০ টাকার কিছুটা কম দিয়ে বলবে,
—চলবে এটা?? আসলে এবার তোমার আংকেলের একটু হা’তের অবস্থা খারাপ আরকি!

হাতের অবস্হা শুধু বেতন দেওয়ার স’ময়েই কি খা’রা’প হয় নাকি?? গত কালকেও ৩০০০ টাকা দিয়ে শাড়ি কিনে এনে আ’মায় দেখিয়ে বলে যে দে’খতো কেমন হয়েছে??তবে এই কথাগু'লো আমি মনে মনে ব’লতাম।

বুঝি না। নিজে ক’'ষ্ট করে টি’উশনি করায়। নিজের মানসিক শ্রমের টা’কা’টা দিতেও ওনাদের এত তাল বাহানা। ভি’ক্ষা তো আর নিচ্ছি না।
একটা কথা ঠিকি বলতো আম্মু,

ব’ড়লো’ক রা সার্থপর হয়। নিজের বেলায় ১৬ আনা বুঝে আর অন্যের বে’লায় সিঁকি আ’নাও বুঝে না।
আজকে যেই অগ্রিম টা’কা'টা নিলাম এটার কা’রন আছে। গত দিন 'বিকেলে আম্মা ফোন করে বলল,

–তোর বাবার শ’রীর খা’রাপ। ঔ’ষধ কেনার টাকা নাই কি ক’রবো আমি??
এই জন্য আজ ল’জ্জা শ’রমের মাথা খেয়ে ত’ন্নীর মায়ের থেকে টা’কা'টা অগ্রিম নিয়ে নি’লাম।

ত’ন্নীকে পড়ানো শেষ করে, মেসের পাশের দোকানে গিয়ে বি’কাশে ৫০০ টাকা সেন্ড করলাম। আ’ম্মুকে আগেই বলে রেখেছিলাম জ’লিল কাকার থেকে 'বিকাশ না’ম্বারটা নিয়ে আমায় দিতে। আম্মু না’ম্বারটা নিয়ে জলিল কা’কার কাছেই ফোন ধরিয়ে দি’য়েছিল। আমার কাছে বি’কাশ নাম্বারটা জ’লিল কাকায় দি’য়েছিলেন।
ফোন করে আম্মাকে বলেছিলাম,

— আম্মা, বা’বার অবস্থা কেমন হয় আমায় কিন্তু জা’নাবা!
১৫০০ থেকে ৫০০ টাকা তো শেষ হয়ে গেল। এখন বাঁচে ১০০০ টাকা। মেস ভাড়াই ৮৫০ টাকা। যদি ভা’ড়াটা দেয় তো মাসটা চলবো কি করে??

৩ বেড শিটের বি’ছানায় আমি থাকতাম মাঝ বেডে। আমার রু’মমেট ২ জন আধা'রাত অবধি ফোনে কথা বলে ঘু’মিয়ে প’ড়লে, আমি আমার প’ড়াশো’না শুরু করতাম। তবে নিঃশব্দে। চোখ বু’লিয়ে। মোমবাতির আলোতে অনেকটা ক'ষ্ট করেই আমাকে পড়তে 'হতো। কারণ টেবিল ল্যাম্প কেনার টাকা আমার কাছে ছিল না। আর এদিকে বড় লাইট জ্বা'’লা’লে রুমমেট ২ জন মিলে অনেক কথা শোনাতো। আমি কিছু বলতে পা’রতাম না জু’নিয়র জন্য। সেজন্য প্র’তিরা’তে আমার একটা করে মোমবাতি মানে প্র’তিরাতে আমার ৫ টাকা করে যেত।

আজ রাত্রে কেমন যেন লাগছে। ম’নটাতে কেমন যেন অ'স্থির লা’গছে। বাবার কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। কে’মন আছে জানিও না। ফোন দিবো?? কিন্তু আমার তো ফোন নাই। আর জ’লিল চাচা যদি ঘু'মে থাকে??

সব চিন্তা বাদ দিয়ে পড়ার দিকে ম’নোযোগ দি’লাম। উফফ, না। ভা’ল্লাগছে না। কেমন যেন চোখে না চাইতেও জল চলে আ’সছে। বা’বার কথা এত মনে পড়ছে কেন?? আর না পেরে রু’মমেট কে জা’গিয়ে তার ফোনটা থেকে কল দিতে বললে সে বলল, আমার ফোনে ব্যালেন্স নাই।

অন্যজনকে জা’গিয়ে তুললে সে বলল, আমার ফো’নতো বন্ধ। চার্জ নাই।
আমার তখন রাগ হয়ে যায়। কি কার’নে রাগ হয় নিজেও জানি না। শুধু এটুকু জানি রাগ করে ওদের ২ জন কে ব’লেছিলাম,

–সা’রারাত অ’মানুষদের সাথে লুতুপুতু করে যাও। তখন টা’কাও থাকবে সাথে ফোনে চার্জ ও।
২ জন চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

আমি রুম থেকে বের হয়ে পাশের রুমে থাকা আমার ফ্রেন্ড তি’সারে ডেকে তুলি। ওর ফোন থেকে কল দেই জ’লিল চাচার ফোনে। কিন্তু কেউ রি’সিভ করে না। প্রায় সা’রারাতই আমি কল দিতে থাকি আর কান্না করতে থাকি। তিসা আ’মায় চুপ করতে বললেও আমি থামতে পারিনি।

শেষ রাত্রের দিকে জ’লিল চাচা ফোন রিসিভ করলে,—হ্যালো, হ্যালো চাচা, বাবা কেমন আছে??
ওপাশ থেকে চাচার কোন কথা না পেয়ে আমি ভয় পেয়ে যায়। এবার জোরে চা’চাকে ডা’কলে চাচা বলে,

–মনু, তোর বাবা আর নাইরে।
আ’মার কানে শুধু কথা টা বা’জঁছিলো। তিসা আমা’কে বার বার ধাক্কা দিচ্ছে,

— কিরে, কি বলে চাচা?? তোর বাবা ঠিক আছে তো??আমি কোন কথা ব’লতে পারি নি। তিসাকে জ’ড়িয়ে ধরে কেঁদে দেই। তিসা আ’মার কান্না দেখে বু’ঝেছিল খারাপ কিছু হয়েছে।বা’বাকে যখন খাটের উপর শেষ দেখা দেখি, আ’মার শুধু বা’বার বলা ঐ কথাটা মনে প’ড়ছিল,

—মা’রে, এই ক’য়টা টাকা ছাড়া আর তো আ’মার কাছে নাই!খা’টের উপরে গিয়ে বাবাকে জ’ড়িয়ে ধরে পা’গলের মতো কেঁদে কেঁদে বলেছিলাম,
–বাবা, তোমার থেকে আমি আর কিছু চাইবো না। শুধু তুমি ফিরে এসো বাবা। আমি নিজে কাজ ক’রবো তবুও তোমায় আর কাজ করতে দিবো না বাবা। ফিরে এসো বাবা, ফিরে এসো।

[অ’ভাবের পরিসমা'প্ত ি ঘটলেও অ’ভাবের কারনে হারিয়ে ফেলা মানুষ গু'’লোকে ভুলে যাওয়া কি এতটাই সহজ??] #সংশোধনীয়
লেখাঃ তাসকিনা